স্বামীর হক ও স্ত্রীর কর্তব্য সম্পর্কে আলোচনা

স্বামীর হক ও স্ত্রীর কর্তব্য সম্পর্কে 

আলোচনা: স্বামীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাঃ স্ত্রী স্বামীর ঘরে বসবাস করে স্বামীর সম্পদ হইতে পানাহার করে, কাপড়-চোপর পরিধান করে কাজেই নিজের স্বামীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা স্ত্রীর কর্তব্য। স্বামীর নাশোকরী করা ঠিক না ।। স্বামীর প্রতি এমন উক্তি করা ঠিক না যে, তোমার ঘরে এসে আমার সুখ শান্তি হইলো না। স্বামীর নাশোকরী করিলে আল্লাহ তা'আলা অসন্তুষ্ট হন। আর আল্লাহ তা'আলা অসন্তুষ্ট হলে দোযখ তাহার জন্য প্রস্তুত হয়ে আয়। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, 

لَا يَنظُرُ اللَّهُ إِلَى امْرَأَةِ لَا تَشْكُرْ لِزَوْجِهَا وَهِيَ لَا تَسْتَغْنَى عَنْهُ 

উচ্চারণ: লাইয়ানজুরুল্লাহু ইলা ইমরাআতিল্লা নাশকুরু লিয়াও জিহা ওয়া হিয়া লাতাশতাগনী আনহু।

অনুবাদঃ আল্লাহ্ তা'আলা সেই স্ত্রীলোকের প্রতি রহমতের দৃষ্টিপাত করেন না, যে নিজ স্বামীর শোকরীয়া আদায় করে না অথচ স্বামী হইতে অমুখাপেক্ষী নয়।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, আমি দোযখের দিকে তাকাইলাম বহু স্ত্রীলোককে সেখানে দেখিলাম। জিজ্ঞাসা করা হইলো ইহার কারণ কি? উত্তর হইলো, তাহারা নিজ স্বামীদের নাশোকরী করিত।

সাজসজ্জা ও বেশভূষা গ্রহণ করা: স্ত্রী নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সাজগোজ করে থাকবে। স্বামী তাহাকে দেখে যেন খুশী হয়। যে ধরনের চালচলন স্বামীর পছন্দ হয় না তাহা হইতে বিরত থাকা উচিত। নিজের সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য অপর পুরুষকে দেখানো যাবে না। কারণ ইহাতে স্বামীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হয় এবং আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূলের অসন্তুষ্টির কারণ হয়। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, যে স্ত্রীলোক নিজ স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষকে দেখানোর জন্যে চোখে সুরমা লাগায় আল্লাহ্ তা'আলা তাহার চেহারা কালো করে দিবেন এবং তাহার কবরকে দোযখের গর্ত বানাইবেন।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আরও বলেছেন, আমি মেরাজের রাত্রিতে একদল স্ত্রীলোককে এই অবস্থায় দেখলাম যে, তাহারা স্তন্যগুলির দ্বারা ঝুলিয়া আছে। এবং তাহাদের নিচের দিকে আগুন জ্বালানো হইতেছে এবং তাহারা নিজেদের শরীরের মাংস খাইতেছে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বললেন, তাহারা ছিল সেই সব স্ত্রীলোক যাহারা পর পুরুষকে নিজের সৌন্দর্য দেখানোর জন্যে সাজসজ্জা করিত।

স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল নামায-রোযা করা নিষেধ: স্বামী যদি অনুমতি না দেয় তবে নফল নামায ও নফল রোযা করা নিষেধ। কারণ স্বামীর হয়তো সঙ্গম করিতে ইচ্ছা করছে স্ত্রী রোযাদার হলে স্বামীর কষ্ট হইবে, তাহার মনের আশা পূরণ হইবে না। কাজেই স্বামী আনুমতি দিলে নফল রোযা করিবে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেন, স্ত্রীর উপর পুরুষের আরও একটি হক এই যে, তাহার অনুমতি ছাড়া স্ত্রী নফল রোযা রাখবে না। যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়ই নফল রোযা রাখে তবে শুধু খানাপিনার কষ্ট ভোগ করিবে। তাহার রোযা কবুল হইবে না।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আরও বলেছেন, কোন স্ত্রীলোক নিজ শয্যা হইতে উঠে স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোযা রাখবে না।

স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘরের বাহির হওয়া: স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘরের বাহির হইবে না। বিনা অনুমতিতে ঘরের বাহির হইলে ভাষার প্রতি ফেরেশতাগণ অভিশাপ বর্ষণ করিতে থাকে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, হখন স্ত্রীলোক ঘর হইতে বাহির হয় এবং স্বামী ইহা পছন্দ করে না তখন আসমানের এতোক ফেরেশতা তাহার প্রতি অভিসম্পাত করিতে থাকে এবং প্রত্যেক বস্তু তাহার উপর লানত বর্ষণ করে থাকে। হহরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, আমি ঐ স্ত্রীলোককে অপছন্দ করি, যে চাদরের আচল টানিয়া টানিয়া ঘরের বাহির হয় এবং নিজ স্বামীর নিন্দা করে।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আরও বলেন, স্ত্রীর কোন অধিকার নাই যে, সে. ঘরের বাহির হয়। তবে হ্যাঁ নিরুপায় অবস্থায় বাহির হইতে পারিবে। কিন্তু চলার সময় রাস্তার মধ্যখান দিয়ে চলবে না। পথের কিনারায় কিনারায় চলবে।

প্রত্যেক ভাল কাজে স্বামীর আনুগত্য করা: স্ত্রীর উপর স্বামীর আর একটি হক আছে যে, স্ত্রী তাহার স্বামীর প্রত্যেক বৈধকাজে আনুগত্য করিবে। ইহা সতী স্ত্রীর নমুনা। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহর জাকওয়ার পর সৎ স্ত্রী অপেক্ষা মুমিনের জন্য আর কোন উত্তম বন্ধু নাই। স্বামী তাহাকে কোন হুকুম দিলে। যে উহা বিনা প্রতিবাদে পালন করে। তাহার প্রতি নজর করিলে স্বামীর মন খুশী হয়। স্বামী অনুপস্থিত থাকিলে নিজের সতীত্ব ও স্বামীর অর্থসম্পদ রক্ষা করিবে।

স্বামীর আনুগত্যের বিনিময়ে স্ত্রী বেহেশতের যে দরজা দিয়ে ইস্থ্য করে সেই দরজা দিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করিবে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, 'যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করে। রমযান মাসে রোযা রাখে, নিজের সতীত্ব রক্ষা করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে সে বেহেশতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছে করিবে প্রবেশ করিতে পারবে।

কাজে ও কথায় স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখা: স্ত্রীর জন্যে খুব বেশি জরুরী কাজ হইলো, কাজে ও কথায় স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখা এবং রাজি রাখিতে আপ্রাণ চেষ্টা করা। যদি স্বামী খুশী থাকে আর ঐ অবস্থায় স্ত্রীর ইনতেকাল হয় তবে সে স্ত্রী বেহেশতী হইবে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, যে স্ত্রীলোক ইনতেকাল করে এবং স্বামী তাহার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে তবে সে বেহেশতে প্রবেশ করিবে।

স্বামীর ডাকে সাড়া দেওয়া: স্বামী যখন মিলনের জন্যে স্ত্রীকে ডাক দিবে তখন স্ত্রীর কর্তব্য হল কোন শরীয়তী ওজর না থাকিলে সমস্ত কাজকর্ম ফেলে স্বামীর খেদমতে হাজির হইতে হইবে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, যখন স্বামী তাহার স্ত্রীকে মিলনের উদ্দেশ্যে ডাক দিবে তখনই এসে হাজির হইতে হইবে। যদি সে চুলার উপরও থাকে। অর্থাৎ রানাবান্নার কাজে ব্যস্ত থাকে এই অবস্থায়।

যদি স্বামীর ডাকা সত্ত্বেও স্ত্রী উপস্থিত না হয় এবং কোন শরীয়তী ওজরও না থাকে, তবে ফেরেশতাগণ তাহার প্রতি আভশাপ দিতে থাকে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, যদি স্বামী-স্ত্রীকে নিজের বিছানায় মিলনের জন্যে ডাকে এবং স্ত্রী অস্বীকার করে অতঃপর স্বামী নারাজ হয়ে রাত্রিযাপন করে তবে এমন স্ত্রীর প্রতি ফেরেশতাগণ ভোর হওয়া পর্যন্ত অভিশাপ বর্ষণ করিতে থাকে।

স্বামীর সেবা-যত্নে মশগুল থাকা: আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত বন্দেগীর পর স্ত্রীও কর্তব্য হইলো স্বামীর খেদমতে নিজেকে বিলিয়ে দিবে। তাকে সেবা-যত্ন করিবে। তাহার কাপড়-চোপর পরিষ্কার করিবে। স্ত্রী নিজের স্বামীর কাপড় ধৌত করিলে আল্লাহ্ তা'আলা রহমতের পানি দ্বারা ঐ স্ত্রীর সমস্ত গোনাহ ধৌত করে দেন।

স্বামীর প্রতি স্ত্রীর এত বেশি কর্তব্য যে, অর্থাৎ স্ত্রীর প্রতি স্বামীর হক এত বেশি যে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, যদি আমি কাহাকেও সিজদা করার আদেশ দিতাম তবে নিশ্চয় স্ত্রীলোককে আদেশ দিতাম সে যেন নিজের স্বামীকে সিজদা করে।

স্বামীর প্রতি স্ত্রীর হক এবং স্বামীর কর্তব্য স্ত্রীর সঙ্গে ভাল ব্যবহার করা, স্বামী-স্ত্রীর সহিত সব সময় ভাল ব্যবহার করিবে।

নারীদের অভ্যাস হইলো তাহারা কথায় কথায় স্বামীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। স্বামীর নাশোকরী করে। আপরিপক্ক জ্ঞানের দ্বারা স্বামীকে যা ইচ্ছা তাই বলে থাকে। স্বামীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফলে স্বামীর মনে কষ্ট হয়। কিন্তু স্বামীর কর্তব্য হইলো, স্ত্রীর কথায় ও ব্যবহারে ধৈর্য ধারণ করা, তাহার প্রতি দয়া পরবশ হয়ে এ সব অন্যায় কথা ও আচরণের দিকে কর্ণপাত না করা। স্ত্রীর অন্যায় আবদারও অনেক সময় রক্ষা করিবে। আল্লাহ তা'আলা কোরআনে বলেছেন,

وَعَاشِرُوهُنَّ بِا الْمَعْرُوفِ 

উচ্চারণ: ওয়া আভিরুহুন্না বিল মা'রুফি অনুবাদঃ তোমরা তাহাদের (স্ত্রীদের) সহিত সদ্ব্যবহার কর।

স্ত্রীকে কখনও কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। তাহার পিতামাতাকে গালি দেওয়া উচিত নয়। তাহার প্রতি জুলুম অত্যাচার করিবে না। স্ত্রীর মোহরানা আদায় করিতে অস্বীকার করিবে না। এমন করিলে আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূলের অসন্তুষ্টির কারণ হইবে।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, ঈমানদার সেই ব্যক্তি যে উত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং নিজ পরিবারের উপর মেহেরবান।

আর একটি হাদীসে আছে, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে নিজের স্ত্রীর সহিত সম্ভাব রাখে ও তাকে ভালবাসে। আমি তোমাদের চেয়ে নিজ স্ত্রীর সহিত সম্ভাব বেশি রাখি ও ভালবাসি।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ইনতেকালের মুহূর্তে তিনটি বিষয়ে উপদেশ দিয়েছেলেন। এই অবস্থায় তাঁহার জবান মোবারক বন্ধ হয়ে গেল এবং বাক্য নিস্তব্দ হলে তিনি আস্তে আস্তে বলতে লাগলেন ১. তোমরা নামায পড়বে, ২. দাস-দাসীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করিবে। ৩. আর স্ত্রীলোক সম্বন্ধে নিশ্চয়ই তাহারা তোমাদের হাতে বন্দিনী। আল্লাহর আমানতের সহিত তোমরা তাহাদিগকে বরণ করে নিয়েছ এবং আল্লাহর কালামের দ্বারা তাহাদের গোপন অঙ্গকে হালাল করেছ।

হাদীসে আরও উল্লেখ আছে, যে ব্যক্তি তাহার স্ত্রীর অসৎ ব্যবহারে সবর করে থাকে আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আইয়ুব (আঃ)-কে তাহার সবরের জন্যে যে নেকী দান করেছিলেন, তিনি তাহাকে সেই নেকী দান করিবেন।

যে স্ত্রী তাহার স্বামীর দুর্ব্যবহারে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ্ তা'আলা ফেরাউনের স্ত্রী হযরত আছিয়াকে যে পূণ্য দিয়েছিলেন তিনি তাহাকেও সেই পূণ্য দান করিবেন। আল্লাহ তাআলা স্ত্রীলোকদিগকে দুর্বল ও গুপ্ত জিনিস সহকারে সৃষ্টি করেছেন, তাহার এই দুর্বলতাহার ঔষৎ হইলো চুপ করে থাকা, আর ঘরের ভিতরে রাখা ও বেপর্দায় চলতে না দেখায়াই হইতেছে ঐ গুপ্ত জিনিসের ঔষধ। তোমরা স্ত্রী লোকদিগকে ভাল উপদেশ দাও কেননা, তাহারা তোমাদের নিকট আবদ্ধ যদি স্ত্রী কোন কথায় স্বামীর উপর রাগ করে কিংবা অন্যায় আদেশ করে বা কোন দোষণীয় কাজ করে তবে উহাতে ধৈর্য ধারণ করিবে।

Comments